ডায়েট না হোক ডাই ইট

সৃষ্টিকর্তা আমাদের শারীরিক গঠন একেকজনের একেক রকম করে দিয়েছেন। কেউ একটু খেলেই মোটা হয়ে যাই, কেউ অনেক খেযেও শুকনো থেকে যান। বাহ্যিক ভাবে বডি শেইপটাই কিন্তু সুস্হতার মাপকাঠি নয়। অনেক সুঠাম স্লিম বডি শেইপের মানুষ হার্ট ব্লক নিয়ে ডাক্তারের স্মরনাপন্ন হন। কাজেই আপনি কি খাচ্ছেন সেটা খেয়াল করুন- আপনাকে কেমন দেখাচ্ছে সেটা কিন্তু বড় কথা নয়। ডায়েটের উদ্দেশ্য হোক সুস্থ থাকা। ডায়েটের উদ্দেশ্য না হোক যে কোন মূল্যে জিরো ফিগার হওয়া।
Healty Food
Healty Food - Pic: Aysha Siddika

লিখেছেন: হোসনে আরা হাসি, ফুড ফ্যান্টাসি ফেইসবুক গ্রুপ মেম্বার

এ সপ্তাহের ডায়েট টপিক নিয়ে কে কি লিখেন বড় আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। এ জমানায় ইন্টারনেটের কল্যাণে সবাই সবজান্তা শমসের। তাই আমি কাউকে জ্ঞান দেয়ার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছি না। ছোট্ট একটু রম্য আলোচনা করতে চাই মাত্র। ভুল ত্রুটি ক্ষমা চাই।

জিহ্বার দুটি কাজ- বাত আর ভাত। মানে কথা বলা আর খাওয়া। দুটো কন্ট্রোলে থাকলে ইহকাল পরকাল দুকালের জন্যই মঙ্গল। অল্প বয়সে বডির মেটাবলিজম রেট বেশি থাকে। তাই খাবারের বাছবিচার না থাকলেও জমার চেয়ে খরচ বেশি হয়ে শরীরটা ছিপছিপেই থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। আমি জাপানে কিছুদিন থেকেছি। সেখানে স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের দেখতাম দিব্যি এটা সেটা খাচ্ছে- আইসক্রিম, চকলেট, ফাস্টফুড। কেউ কেউ একটু ওভারওয়েট। তবে এরাই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে যখন কর্মজীবন শুরু করে, তখন রীতিমত সচেতন হয়ে যায়। ছিপছিপে সুঠাম গড়পড়তা জাপানীদের যেমন দেখেন। যারা বলেন, ভাত খাওয়া মানেই মুটিয়ে যাওয়া, তারা জাপানীদের দেখতে পারেন, ভাত তারা ছাড়ে না, খায় মাত্র ছোট এক বাটি।তবুও মেদ তাদের ছেড়ে যায়। কাজেই ডায়েটের ফর্মূলা মানেই ভাত ছেড়ে দেওয়াই কিন্তু নয়।

বাঙালির মুটিয়ে যাওয়ার কারণগুলি যদি দেখতে চান, তবে সেগুলো মোটামুটি এরকম-

১। ঝাল

২। ঝোল

৩। চা

৪। আনহেলদি স্ন্যাকস

৫। সব্জি ফলমূলে অরুচি

৬। বডি মুভমেন্ট কম ইত্যাদি।

১। অামরা ভাত খাই ঝাল, ঝোল দিয়ে মেখে। ভর্তা বা ঝাল তরকারি এনজয় করতে গিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভাত খেয়ে ফেলি। ঝোল জিনিসটা কিন্তু কারসাজি। মানে মসলা কষানোর পুরো তেলটাই ঝোলের সাথে আপনার পেটে চলে যাচ্ছে।

২। একটা স্বাস্হ্যকর পানীয়কে গলা টিপে হত্যা করে পান করা হলো বাঙালি চা। কড়া লিকারের দুধ চা, বেশি চিনি দেয়া কফি বা চা কোনটাই স্বাস্হ্যকর না। আমার কথা হলো আপনি চিনি ছাড়তে না পারুন তো চা ছেড়ে দিন। অথবা মধু ব্যবহার করুন। জিরো ক্যাল জিনিসটা কৃত্তিম এব্ং সেটা কিন্তু আরো খারাপ।

৩। বাঙালির বৈকালিক বা সান্ধ্যকালীন স্ন্যাকস মানেই ভাজাপোড়া। সেগুলো মানেই ময়দা আর আলু। ভেজিটেবল রোল টোল বলে যা তৈরি হয়, তাও মূলত আলুর প্রাধান্য। এরচেয়ে চিকেন পুর, বা ডাল সবজির কম্বিনেশন ভাল। ডিপ ফ্রাই থেকে ছেঁকা বা বেকিং গ্রিল এগুলো অনেক স্বাস্হ্যকর।

৪। সবজি মানে আলু!!! কুয়াকাটা ঘুরতে গিয়ে দেখলাম হোটেলে রুটির সাথে ভেজিটেবল বলে যা দেয়, তা হলো আলু আর গাজর। ভাইরে ভেজিটেবল হতে হবে আঁশযুক্ত। রান্না করতে গিয়ে স্বাদ বাড়ানোর জন্য ভাজতে ভাজতে রানতে রানতে এটার চেহারা বদলে ফেললে সেটা আর ভেজিটেবল থাকে না। আপনি রান্না ভেজিটেবল না খেতে পারেন, কাঁচা ফল খান, সালাদ খান, শাক খান। আর নিজের পোলাপানকে ওরকম লাক্সারি সব্জি রেঁধে খাইয়ে বড় করবেন না। সবজিকে সবজি হিসেবেই যেন তারা খেতে শেখে খেয়াল রাখবেন। অভ্যেস করলেই হয়। আপনি হয়তো পারেননি, ওদের শেখান।ডায়েটের আলোচনায় মুভমেন্টের বিষয়টা তুললাম না। তবে যারা ডায়েট করতে চান তাদের জন্য কিছু পরামর্শ রইল- সবই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলা-

১। ডায়েটের ফল পেতে সময় লাগে- চাই ধৈর্য

২। প্রচলিত সিস্টেম ফলো না করে নিজের জন্য সুইটেবল কিছু বেছে নিন, মানে যেসব ফুড মেন্যু আপনি ভালবাসেন সেগুলোর হেলদি সংস্করণ। মনে রাখবেন জোর করে ওজন কমাতে গেলে যখনি আপনি আর পারবেন না ছেড়ে দেবেন, তখনি আবার আগের চেয়ে খারাপ অবস্হায় ফিরে যাবেন। একে বলা হয় ইয়ো ইয়ো এফেক্ট। বরং বডিকে এই মেসেজ দিন যে আমি সবই খেতে পারব, তবে পরিমিত। ট্যাপিং করে কমাবো।

৩। ডায়েট মেন্যুগুলোকে বিস্বাদ বানিয়ে ফেলবেন না। ডায়েট না হয়ে যেন ডাই ইট না হয়। হেলদি মেন্যুও সুস্বাদু করা যায়। আপনার রুচি বুঝে বেছে নিন। বিস্বাদ খাবার খেলে দুদিনেই হাঁপিয়ে উঠে ডায়েটের ইচ্ছা চলে যাবে কিন্তু।

৪। নানারকম স্যুপ খাবারের আগে খেতে পারেন, এগুলো পেটের অনেকটা জায়গা ভরিয়ে দেবে। তখন আপনি এমনিতেও কম খেতে পারবেন।দৈনন্দিন লাইফ স্টাইলে ফুড মেন্যু বুঝে শুনে ফলো করলে মাঝে মাঝে সৌখিন অনিয়মে সমস্যা হবে না। দাওয়াত, উৎসব, ঘরোয়া আয়োজন এনজয় করতে পারবেন।

ডায়েটের উদ্দেশ্য সুস্হ থাকা, বয়স অনুযায়ী সঠিক ওজন ধরে রাখা। একটু প্লাস মাইনাস মাঝে মাঝে হতেই পারে।

বড় কোন অসুস্হতা আমাদের অনেক কিছুই কেড়ে নেয়। অনেক ধরনের খাবারে আমৃত্যু নিষেধাজ্ঞা চলে আসে। অথচ পরিমিত খেয়ে আমরা কোন কিছু একদম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্হিতি এড়াতে পারি।

শেষে একটা কথা বলি। সৃষ্টিকর্তা আমাদের শারীরিক গঠন একেকজনের একেক রকম করে দিয়েছেন। কেউ একটু খেলেই মোটা হয়ে যাই, কেউ অনেক খেযেও শুকনো থেকে যান। বাহ্যিক ভাবে বডি শেইপটাই কিন্তু সুস্হতার মাপকাঠি নয়। অনেক সুঠাম স্লিম বডি শেইপের মানুষ হার্ট ব্লক নিয়ে ডাক্তারের স্মরনাপন্ন হন। কাজেই আপনি কি খাচ্ছেন সেটা খেয়াল করুন- আপনাকে কেমন দেখাচ্ছে সেটা কিন্তু বড় কথা নয়।

ডায়েটের উদ্দেশ্য হোক সুস্থ থাকা।ডায়েটের উদ্দেশ্য না হোক যে কোন মূল্যে জিরো ফিগার হওয়া।

লিখেছেন: হোসনে আরা হাসি

ফুড ফ্যান্টাসি গ্রুপ মেম্বার